সুরমা সিলেট ডেস্ক::
সম্প্রতি বাড়িতে সন্তান প্রসবের পর সাফজয়ী নারী ফুটবলার রাজিয়া খাতুন (২১) মৃত্যুর খবর মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সচেতনতার বিষয়ে বড় একটি বার্তা বহন করছে।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাড়িতে প্রসবের ঝুঁকি এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রতি অবহেলা ও অসচেতনতার চিত্র ফুটে ওঠে। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রসবে উৎসাহী করতে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির বিষয়টিও আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।
রাজিয়া খাতুন বাংলাদেশ নারী ফুটবল টিমের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলেই পরিচিত। ২০১৮ সালে ভুটানে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের সদস্যও ছিলেন তিনি। ১৩ মার্চ রাত ১০টার দিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীনাথপুরে নিজ বাড়িতে ধাত্রীর সহযোগিতায় সন্তানের জন্ম দেন রাজিয়া খাতুন। সন্তান প্রসবের কয়েক ঘণ্টা পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। রাত সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
ফুটবলার রাজিয়া খাতুনকে প্রথমে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসতাপালে নিয়ে আসার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকদের ধারণা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রাজিয়া সুলতানা মৃত্যুবরণ করেছেন। রক্তক্ষরণেই বেশি মাতৃমৃত্যু হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ (বিএমএসএস) ২০১৬-এর এক প্রতিবেদন রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, মাতৃমৃত্যুর ৩৯ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে। গর্ভকালে প্রায় ১৮ শতাংশ এবং প্রসব–পরবর্তী সময়ে ২১ শতাংশের বেশি মাতৃমৃত্যু হয় রক্তক্ষরণে। তাছাড়া ওই প্রতিবেদনটিতে প্রসবকালে জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ, গর্ভকালে রক্তক্ষরণ, জটিল গর্ভপাত, গর্ভধারণে জটিলতা, ধনুষ্টংকার ও বিলম্বিত প্রসবে মৃত্যু—এই সাত কারণেও মাতৃমৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় সন্তান জন্মদানকালে মাতৃমৃত্যু অনেকাংশে স্বাভাবিক মনে হলেও সময় পালটে গেছে। তারপরও নানা অবহেলায় এখনও প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু হয়েই থাকে। তবে মাতৃমৃত্যুর এই শঙ্কা অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায় একটু সচেতন হতে পারলে। সম্প্রতি বাড়িতে সন্তান প্রসবের পর সাফজয়ী নারী ফুটবলার রাজিয়া সুলতানার (২১) মৃত্যুর খবর মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সচেতনতার বিষয়ে বড় একটি বার্তা বহন করছে। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাড়িতে প্রসবের ঝুঁকি এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রতি অবহেলা ও অসচেতনতার চিত্র ফুটে ওঠে। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রসবে উৎসাহী করতে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির বিষয়টিও আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।
রোজায় পানিশূন্যতা এড়ানোর ৫ উপায়রোজায় পানিশূন্যতা এড়ানোর ৫ উপায়
২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২ এর পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে গড়ে ১৫৩ জন মা মারা যান। গ্রামে এ হার ১৫৭ এবং শহরে ১৩৫। অর্থাৎ শহরেও পরিস্থিতি বেশ নাজুক। মাতৃস্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবের ফলেই এমনটি হয়ে থাকে বলে অনেকের অভিমত। উল্লেখ্য, গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর ৪২ দিনের মধ্যে মৃত্যুকে ‘মাতৃমৃত্যু’ বলা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, এখনও ৪২ শতাংশ শিশুর জন্মদান করা হয় বাড়িতে। কিন্তু এক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা জরুরি।
দেশে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমেছে। কিন্তু তারপরও রক্তক্ষরণেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ হয়। এ ব্যাপারে গাইনি বিশেষজ্ঞ রহিমা বেগম জানান, ‘গর্ভফুল জরায়ুর গায়ে লাগানো থাকে। কোনো কারণে গর্ভফুল জরায়ুর গা থেকে আলগা হয়ে গেলে বা জরায়ুতে শিশু ওপরে ও গর্ভফুল নিচে চলে এলে প্রসবের সময় রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। প্রসব–পরবর্তী সময়েই রক্তক্ষরণে মাতৃমৃত্যু বেশি ঘটে। এক্ষেত্রে প্রসবের পরে জরায়ু সংকুচিত না হওয়া; জরায়ু বা প্রসবপথ ছিঁড়ে যাওয়া, গর্ভফুল বা তার অংশ জরায়ুতে থেকে যাওয়া, রক্ত জমাট বাঁধতে না পারার কারণেও প্রসবের পরে রক্তক্ষরণ হতে পারে’।
ইফতারের পর যেসব অভ্যাসে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিইফতারের পর যেসব অভ্যাসে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
জটিলতা হতে পারে গর্ভধারণে
অনেকে শারীরিকভাবে নিজেকে সক্ষম ভেবে আর গর্ভকালীন চিকিৎসাসেবা নিতে চান না। রহিমা ম্যাটারনিটির চিকিৎসক রহিমা বেগম জানান, ‘অনেকে ভাবেন তারা শারীরিকভাবে সক্ষম ও সুস্থ। প্রসবের সময় কোনো সমস্যা হবে না ভেবে অনেকেই আর চিকিৎসকের কনসালট্যান্সি নেন না। মূলত স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অবহেলা ও সচেতনতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের তুলনায় স্বল্প ঝুঁকির গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যু বেশি হয়েছে। একাধিক সন্তান জন্ম দিয়েছেন এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রয়েছে, এমন মায়েরা ঝুঁকির কথা ভেবে নিয়মিত প্রসব–পূর্ব সেবা নিয়েছেন ও হাসপাতালে প্রসব করেছেন। তুলনাক্রমে কম বয়সী, প্রথম গর্ভধারণ করা মা বা কোনো ঝুঁকি নেই এমন মা প্রসব–পূর্ব সেবা না নেওয়ায় বাড়িতে প্রসব করে জটিলতায় ভুগেছেন। অনেক ক্ষেত্রে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। গর্ভধারণ স্বাভাবিক বিষয় হলেও এটা যেকোনো সময় জটিল হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, হাসপাতালে প্রসব হলে যেকোনো জটিলতায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। স্বাভাবিক প্রসবের পর ৫০০ মিলিলিটারের বেশি রক্তক্ষরণ হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হয়। দ্রুত চিকিৎসার নিতে পারলে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে মা সুস্থ হয়ে ওঠেন। হাসপাতালে আনার পাশাপাশি মায়ের রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী রক্তদাতা তৈরি রাখতে হবেই।


















